Monday, 8 February 2016

সুরা কাহাফ বাংলা অনুবাদ, ১ থেকে ২৬ আয়াত পর্যন্ত।

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجَا

01

সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নিজের বান্দার প্রতি এ গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তাতে কোন বক্রতা রাখেননি।

قَيِّمًا لِّيُنذِرَ بَأْسًا شَدِيدًا مِن لَّدُنْهُ وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا

02

একে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ভীষণ বিপদের ভয় প্রদর্শন করে এবং মুমিনদেরকে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করে-তাদেরকে সুসংবাদ দান করে যে, তাদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে।

مَاكِثِينَ فِيهِ أَبَدًا

03

তারা তাতে চিরকাল অবস্থান করবে।

وَيُنذِرَ الَّذِينَ قَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا

04

এবং তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করার জন্যে যারা বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে।

مَّا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ وَلَا لِآبَائِهِمْ كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا

05

এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও নেই। কত কঠিন তাদের মুখের কথা। তারা যা বলে তা তো সবই মিথ্যা।

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا

06

যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি পরিতাপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন।

إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا

07

আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্যে শোভা করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভাল কাজ করে।

وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا

08

এবং তার উপর যাকিছু রয়েছে, অবশ্যই তা আমি উদ্ভিদশূন্য মাটিতে পরিণত করে দেব।

أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا

09

আপনি কি ধারণা করেন যে, গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল ?

إِذْ أَوَى الْفِتْيَةُ إِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوا رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

10

যখন যুবকরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয়গ্রহণ করে তখন দোআ করেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন।

فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا

11

তখন আমি কয়েক বছরের জন্যে গুহায় তাদের কানের উপর নিদ্রার পর্দা ফেলে দেই।

ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ أَيُّ الْحِزْبَيْنِ أَحْصَى لِمَا لَبِثُوا أَمَدًا

12

অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে।

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى

13

আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

وَرَبَطْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَن نَّدْعُوَ مِن دُونِهِ إِلَهًا لَقَدْ قُلْنَا إِذًا شَطَطًا

14

আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বললঃ আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে।

هَؤُلَاء قَوْمُنَا اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّوْلَا يَأْتُونَ عَلَيْهِم بِسُلْطَانٍ بَيِّنٍ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا

15

এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চাইতে অধিক গোনাহগার আর কে?

وَإِذِ اعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنشُرْ لَكُمْ رَبُّكُم مِّن رَّحمته ويُهَيِّئْ لَكُم مِّنْ أَمْرِكُم مِّرْفَقًا

16

তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের এবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয়গ্রহণ কর। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ কর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন।

وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَاوَرُ عَن كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِي فَجْوَةٍ مِّنْهُ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ مَن يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي وَمَن يُضْلِلْ فَلَن تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُّرْشِدًا

17

তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বামদিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ وَكَلْبُهُم بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا

18

তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংক গ্রস্ত হয়ে পড়তে।

وَكَذَلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءلُوا بَيْنَهُمْ قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالُوا رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ فَابْعَثُوا أَحَدَكُم بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنظُرْ أَيُّهَا أَزْكَى طَعَامًا فَلْيَأْتِكُم بِرِزْقٍ مِّنْهُ وَلْيَتَلَطَّفْ وَلَا يُشْعِرَنَّ بِكُمْ أَحَدًا

19

আমি এমনি ভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললঃ তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বললঃ একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি। কেউ কেউ বললঃ তোমাদের পালনকর্তাই ভাল জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়।

إِنَّهُمْ إِن يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَن تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا

20

তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।

وَكَذَلِكَ أَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوا أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَأَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيهَا إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِم بُنْيَانًا رَّبُّهُمْ أَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِم مَّسْجِدًا

21

এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কেয়ামতে কোন সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বললঃ তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বললঃ আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে মসজিদ নির্মান করব।

سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ قُل رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِم مَّا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاء ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِم مِّنْهُمْ أَحَدًا

22

অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবেঃ তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে; তারা পাঁচ জন। তাদের ছষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবেঃ তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুনঃ আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভাল জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া আপনি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবেন না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও করবেন না।

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا

23

আপনি কোন কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামী কাল করব।

إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ وَاذْكُر رَّبَّكَ إِذَا نَسِيتَ وَقُلْ عَسَى أَن يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا

24

‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যান, তখন আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করুন এবং বলুনঃ আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথ নির্দেশ করবেন।

وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا

25

তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে।

قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا

26

বলুনঃ তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত চমৎকার দেখেন ও শোনেন। তিনি ব্যতীত তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।

Sunday, 7 February 2016

স্বর্ন ও রৌপ্যের যাকাত কিভাবে আদায় করতে হবে?

প্রশ্ন :-স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানাবেন।
___________________________
উত্তর :-
স্বর্ণ ও রৌপ্য খনিজ সম্পদের অন্যতম। এ সম্পদের অপ্রতুলতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাতি এ দু’টি ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈরী করেছে ও দ্রব্যমূল্যের মান হিসাবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে ইসলামী শরী‘আত স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তার উপর যাকাত ফরয করেছে। আর যাকাত অনাদায়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ- يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ-

‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও। সেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে আর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর’ (তওবা ৯/৩৪-৩৫)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلاَ فِضَّةٍ لاَ يُؤَدِّى مِنْهَا حَقَّهَا إِلاَّ إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحَ مِنْ نَارٍ فَأُحْمِىَ عَلَيْهَا فِىْ نَارِ جَهَنَّمَ فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِيْنُهُ وَظَهْرُهُ كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيْدَتْ لَهُ فِىْ يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيُرَى سَبِيْلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ-

‘প্রত্যেক স্বর্ণ ও রৌপ্যের মালিক যে তার হক (যাকাত) আদায় করে না, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের বহু পাত তৈরী করা হবে এবং সে সমুদয়কে জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন পুনরায় তাকে গরম করা হবে। (তার সাথে এরূপ করা হবে) সেদিন, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। (তার এ শাস্তি চলতে থাকবে) যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে’
( মুসলিম হা/৯৮৭; মিশকাত হা/১৭৭৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়; বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ৪/১২৩ পৃঃ)
_____________________

👉 স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিছাব

কারো নিকটে ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য থাকলেই কেবল তার উপর যাকাত ফরয। এ দু’টি ধাতুর নিছাব নিম্নে উল্লেখ করা হল,

স্বর্ণের নিছাব :
 এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَىْءٌ يَعْنِيْ فِيْ الذَّهَبِ حَتَّى يَكُوْنَ لَكَ عِشْرُوْنَ دِيْنَارًا فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُوْنَ دِيْنَارًا وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيْهَا نِصْفُ دِيْنَارٍ فَمَا زَادَ فَبِحِسَابِ ذَلِكَ-

‘বিশ দ্বীনারের কম স্বর্ণে যাকাত ফরয নয়। যদি কোন ব্যক্তির নিকট ২০ দ্বীনার পরিমাণ স্বর্ণ এক বছর যাবৎ থাকে তবে এর জন্য অর্ধ দ্বীনার যাকাত দিতে হবে। এরপরে যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐভাবেই হবে’।[1]

উল্লেখ্য যে, হাদীছে বর্ণিত ১ দ্বীনার সমান ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। অতএব ২০ দ্বীনার সমান ২০ × ৪.২৫ = ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ। ১ ভরি সমান ১১.৬৬ গ্রাম হলে, ৮৫ ÷১১.৬৬ = ৭.২৯ ভরি বা ৭ ভরী ৫ আনা ৫ রতী স্বর্ণ। অর্থাৎ কারো নিকটে উল্লিখিত পরিমাণ স্বর্ণ এক বছর যাবৎ থাকলে তার উপর উক্ত স্বর্ণের বর্তমান বিক্রয় মূল্যের হিসাবে মোট সম্পদের ২.৫০% যাকাত দেওয়া ফরয।

রৌপ্যের নিছাব : রৌপ্যের নিছাব উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

وَلاَ فِيْ أَقَلَّ مِنْ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ-

‘পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যে যাকাত নেই’।[2]

উল্লেখ্য, ১ উকিয়া সমান ৪০ দিরহাম। অতএব ৫ উকিয়া সমান ৪০×৫=২০০ দিরহাম।

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

هَاتُوْا رُبْعَ الْعُشُوْرِ مِنْ كُلِّ أَرْبَعِيْنَ دِرْهَمًا دِرْهَمٌ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ شَىْءٌ حَتَّى تَتِمَّ مِائَتَىْ دِرْهَمٍ فَإِذَا كَانَتْ مِائَتَىْ دِرْهَمٍ فَفِيْهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ فَمَا زَادَ فَعَلَى حِسَابِ ذَلِكَ-

‘তোমরা প্রতি ৪০ দিরহামে ১ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। ২০০ দিরহাম পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের প্রতি কিছুই ফরয নয়। ২০০ দিরহাম পূর্ণ হলে এর যাকাত হবে পাঁচ দিরহাম এবং এর অতিরিক্ত হলে তার যাকাত উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী প্রদান করতে হবে’।[3]

অত্র হাদীছে বর্ণিত ২০০ দিরহাম সমান ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য। ১ ভরি সমান ১১.৬৬ গ্রাম হলে ৫৯৫ গ্রাম সমান ৫৯৫ ÷ ১১.৬৬ = ৫১.০২ ভরি রৌপ্য হয়। উক্ত পরিমাণ রৌপ্য কারো নিকটে এক বছর যাবৎ থাকলে তার উপর বর্তমান বিক্রয় মূল্যের হিসাবে মোট সম্পদের ২.৫০% যাকাত আদায় করা ফরয।

[1]. আবূদাউদ হা/১৫৭৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, আলবানী, সনদ ছহীহ।

[2]. বুখারী হা/১৪৮৪, ‘যাকাত’ অধ্যায়, মুসলিম হা/৯৭৯; মিশকাত হা/১৭৯৪।

[3]. আবূদাউদ হা/১৫৭২, ‘যাকাত’ অধ্যায়, আলবানী, সনদ ছহীহ।
_______________________
👉 স্বর্ণ ও রৌপ্য উভয়টি মিলে নিছাব পরিমাণ হলে যাকাত ফরয হবে কি?

👉 কারো নিকট স্বর্ণ ও রৌপ্য পৃথকভাবে কোনটিই নিছাব পরিমাণ নেই। কিন্তু উভয়টি মিলে নিছাব পরিমাণ হয়। এক্ষণে তার উপর যাকাত ফরয হবে কি-না?

 এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

 তবে ছহীহ মত হল, স্বর্ণ ও রৌপ্য দু’টি ভিন্ন বস্ত্ত। একটি অপরটির নিছাব পূর্ণ করতে সক্ষম নয়। সুতরাং এ দু’টি পৃথকভাবে নিছাব পরিমাণ না হলে যাকাত ফরয নয়।[1]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যে যাকাত নেই’।[2]

 তিনি অন্যত্র বলেন, ‘বিশ দ্বীনারের কম স্বর্ণে যাকাত ফরয নয়’।[3]

উল্লিখিত হাদীছ দু’টিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিছাব আলাদাভাবে বর্ণনা করেছেন। কারণ দু’টি বস্ত্ত অভিন্ন নয় বরং আলাদা। অতএব পৃথকভাবে দু’টির নিছাব পূর্ণ হলেই কেবল যাকাত ফরয হবে। অন্যথা ফরয নয়।

[1]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ৬/১০১-১০২ পৃঃ; ফিক্বহুস সুন্নাহ ২/১৮ পৃঃ; তামামুল মিন্নাহ ৩৬০ পৃঃ।

 [2]বুখারী হা /১৪৮৪, ‘যাকাত’ অধ্যায়, মুসলিম হা/৯৭৯; মিশকাত হা/১৭৯৪। [3]. আবূদাউদ হা/১৫৭৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, আলবানী, সনদ ছহীহ।
____________________
👉মহিলাদের ব্যবহৃত অলংকারের যাকাতঃ

ব্যবসায়িক স্বর্ণ অর্থাৎ যে স্বর্ণ ব্যবসার উদ্দেশ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে সে স্বর্ণের যাকাত ফরয এবং হারাম কাজে ব্যবহৃত স্বর্ণ যেমন পুরুষের ব্যবহৃত স্বর্ণ এবং কোন প্রাণীর আকৃতিতে বানানো নারীর অলংকার যা ব্যবহার করা হারাম, এরূপ ব্যবহৃত স্বর্ণেরও যাকাত ফরয। এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন। কারণ স্বর্ণের এরূপ ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়।

পক্ষান্তরে বৈধ পন্থায় নারীর ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ফরয কি-না? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হল, নারীর ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয।

 নারীর ব্যবহারিক অলংকারের যাকাত সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ أَنَّ امْرَأَةً أَتَتْ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَمَعَهَا ابْنَةٌ لَهَا وَفِيْ يَدِ ابْنَتِهَا مَسَكَتَانِ غَلِيْظَتَانِ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ لَهَا أَتُعْطِيْنَ زَكَاةَ هَذَا قَالَتْ لاَ قَالَ أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ اللهُ بِهِمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ قَالَ فَخَلَعَتْهُمَا فَأَلْقَتْهُمَا إِلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَقَالَتْ هُمَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَلِرَسُوْلِهِ-

আমর ইবনু শু‘আইব (রাঃ) হতে বর্ণিত, এক মহিলা তার কন্যাসহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে আসলেন। তার কন্যার হাতে মোটা দু’টি স্বর্ণের বালা ছিল। তিনি তাকে বললেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? মহিলাটি বললেন, না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি কি পসন্দ কর যে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা এর পরিবর্তে তোমাকে এক জোড়া আগুনের বালা পরিধান করান? রাবী বলেন, একথা শুনে মেয়েটি তার হাত থেকে তা খুলে নবী (ছাঃ)-এর সামনে রেখে দিয়ে বলল, এ দু’টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য।[1]

অন্য হাদীছে বর্ণিত আছে, মা আয়েশা (রাঃ) বলেন,

دَخَلَ عَلَىَّ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَرَأَى فِيْ يَدِيْ فَتَخَاتٍ مِنْ وَرِقٍ فَقَالَ مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ فَقُلْتُ صَنَعْتُهُنَّ أَتَزَيَّنُ لَكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ أَتُؤَدِّيْنَ زَكَاتَهُنَّ قُلْتُ لاَ أَوْ مَا شَاءَ اللهُ قَالَ هُوَ حَسْبُكِ مِنَ النَّارِ-

‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার হাতে রূপার বড় বড় আংটি দেখতে পান এবং বলেন, হে আয়েশা! এটা কি? আমি বললাম, হে রাসূল (ছাঃ)! আপনার উদ্দেশ্যে সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য তা তৈরী করেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? আমি বললাম, না অথবা আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল। তিনি বললেন, তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।[2] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيْدَ قَالَتْ دَخَلْتُ أَنَا وَخَالَتِيْ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَعَلَيْهَا أَسْوِرَةٌ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ لَنَا أَتُعْطِيَانِ زَكَاتَهُ قَالَتْ فَقُلْنَا لاَ قَالَ أَمَا تَخَافَانِ أَنْ يُسَوِّرَكُمَا اللهُ أَسْوِرَةً مِنْ نَارٍ أَدِّيَا زَكَاتَهُ-

আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার খালা হাতে স্বর্ণের বালা পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরবারে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে বললেন, তোমরা এর যাকাত দাও কি? তিনি বলেন, তখন আমরা বললাম, না। তখন তিনি (ছাঃ) বললেন, ‘তোমরা কি ভয় কর না যে, এর পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা আগুনের বালা পরিধান করাবেন। সুতরাং তোমরা যাকাত আদায় কর’।[3]

ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন,

سَأَلَتْهُ امْرَأَةٌ عَنْ حُلِيٍّ لَهَا أَفِيْهِ زَكَاةٌ؟ قَالَ إِذَا بَلَغَ مِائَتَيْ دِرْهَمٍ فَزَكِّيْهِ، قَالَتْ إِنَّ فِيْ حِجْرِيْ أَيْتَامًا فَأَدْفُعُهُ إِلَيْهِمْ؟ قَالَ نَعَمْ-

‘এক মহিলা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে, অলংকারের যাকাত দিতে হবে কি? তিনি বললেন, যদি তা দুইশত দিরহামে পৌঁছে, তাহলে তার যাকাত আদায় করবে। মহিলাটি বললেন, আমার ঘরে কতিপয় ইয়াতীম রয়েছে, তাদেরকে কি (যাকাত) প্রদান করতে পারব? তিনি বললেন, হ্যাঁ’।[4]

আয়েশা (রাঃ) বলেন, لاَ بَأْسَ بِلُبْسِ الْحُلِيِّ إِذَا أَعْطَى زَكَاتَهُ ‘অলংকার পরিধানে কোন সমস্যা নেই, যদি তার যাকাত দেওয়া হয়’।[5]

উপরোল্লিখিত হাদীছ ও আছার সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নারীর ব্যবহৃত অলংকার নিছাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে।

[1]. আবূদাউদ হা/১৫৬৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘গচ্ছিত সম্পদ ও অলংকারের যাকাত’ অনুচ্ছেদ, সনদ হাসান। [2]. আবূদাউদ হা/১৫৬৫, সনদ ছহীহ। [3]. মুসনাদে আহমাদ হা/২৭৬৫৫; ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৭৭০, সনদ ছহীহ লিগায়রিহি (হাসান)। [4]. মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক ৪/৮৩ পৃঃ; মু‘জামুল কাবীর লিত ত্ববারানী ৯/৩৭১ পৃঃ; সনদ ছহীহ লিগায়রিহি। [5]. দারাকুত্বনী ২/১০৭ পৃঃ; বায়হাক্বী ৪/১৩৯ পৃঃ; সনদ হাসান।
___________________
👉 নারীর ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয নয় মর্মে পেশকৃত দলীলের জবাবঃ

কিছু সংখ্যক বিদ্বান নারীর ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয নয় বলে মত পোষণ করেছেন এবং তাদের মতের স্বপক্ষে কতিপয় দলীল পেশ করেছেন। নিম্নে সেই দলীলগুলো উল্লেখ করতঃ তার জবাব দেওয়া হল।

প্রথম দলীল : আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, لَيْسَ فِيْ الْحُلِىِّ زَكَاةٌ ‘অলংকারের যাকাত নেই’।[1]

জবাব : প্রথমত হাদীছটি যঈফ। ইমাম দারাকুত্বনী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন।[2] ইমাম বায়হাক্বী হাদীছটিকে ভিত্তিহীন বলেছেন।[3] নাছিরুদ্দ্বীন আলবানীও হাদীছটিকে যঈফ এমনকি বাতিল বলে উল্লেখ করেছেন।[4] অতএব উক্ত হাদীছটি যঈফ বলে দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়তঃ হাদীছটি উপরোল্লিখিত ছহীহ হাদীছ ও আছার সমূহের বিরোধী হওয়ায় তা পরিত্যাজ্য।

দ্বিতীয় দলীল : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, تَصَدَّقْنَ وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ ‘তোমরা তোমাদের অলংকার দ্বারা হলেও যাকাত আদায় কর’।[5] অলংকারের যাকাত ফরয হলে রাসূল (ছাঃ) ‘তোমাদের অলংকার দ্বারা হলেও’ না বলে বলতেন ‘তোমাদের অলংকারের যাকাত আদায় কর’।

জবাব : অত্র হাদীছ ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না। কেননা যদি কেউ কারো ব্যয়ভার বহন করার লক্ষ্যে এমন অর্থ প্রদান করে, যা নিছাব পরিমাণ হয়। অতঃপর সে যদি বলে, তুমি যাকাত আদায় করবে যদিও তোমাকে প্রদানকৃত অর্থ থেকে হয়। তার এরূপ কথা যেমন উক্ত অর্থের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না, তেমনি উল্লিখিত হাদীছ দ্বারাও ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না।[6]

তৃতীয় দলীল : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِيْ عَبْدِهِ وَلاَ فَرَسِهِ صَدَقَةٌ ‘মুসলিমের উপর তার দাস ও ঘোড়ার যাকাত নেই’।[7] দাস এবং ঘোড়া মানুষের প্রয়োজনীয় বস্ত্ত হওয়ায় যাকাত ফরয নয়। তেমনি নারীর ব্যবহৃত অলংকার প্রয়োজনীয় বস্ত্ত হওয়ায় যাকাত ফরয নয়।

জবাব : নারীর ব্যবহৃত অলংকারকে দাস ও ঘোড়ার উপর ক্বিয়াস করা দু’টি কারণে সঠিক নয়। (ক) উক্ত ক্বিয়াস উপরোল্লিখিত ছহীহ হাদীছ সমূহের বিরোধী। আর ছহীহ হাদীছ বিরোধী ক্বিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। (খ) উক্ত ক্বিয়াস অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা মৌলিক দিক থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত ফরয। পক্ষান্তরে দাস ও ঘোড়ার যাকাত ফরয নয়। অতএব মৌলিক দিক থেকে যাকাত ফরয নয় এমন বস্ত্তর সাথে যাকাত ফরয হওয়া বস্ত্তর ক্বিয়াস করা সঠিক নয়।[8]

চতুর্থ দলীল : নারীর ব্যবহৃত অলংকার বর্ধনশীল নয়। অতএব অবর্ধনশীল বস্ত্তর যাকাত ফরয নয়।

জবাব : স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য বর্ধনশীল হওয়া শর্ত নয়। যেমন কেউ যদি তার নিকট নিছাব পরিমাণ টাকা জমা করে রাখে, যা দিয়ে সে কোন ব্যবসা করে না। বরং সেই টাকা থেকে শুধু খায় ও পান করে। তবুও তার উপর যাকাত ফরয। অতএব ব্যবহৃত অলংকার বর্ধনশীল না হলেও তার উপর যাকাত ফরয।[9]

[1]. তিরমিযী হা/৬৩৬; দারাকুত্বনী ২/১০৭ পৃঃ। [2]. নাছবুর রিওয়ায়া ২/৩৪৭ পৃঃ। [3]. মা‘রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার ৩/২৯৮ পৃঃ। [4]. যঈফুল জামে‘ হা/৪৯০৬; ইরওয়াউল গালীল হা/৮১৭। [5]. বুখারী হা/১৪৬৬; মুসলিম হা/১০০০; মিশকাত হা/১৮০৮। [6]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ৬/১৩০ পৃঃ। [7]. বুখারী হা/১৪৬৪; মুসলিম হা/৯৮২। [8]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ৬/১৩০ পৃঃ। [9]. তদেব।

👉👉জেনে রাখা প্রয়োজন যে, মহিলারা বিনা যাকাতে 84 গ্রাম স্বর্ণের গহনা এবং 590 গ্রাম রুপার গহনা পরতে পারে ।
অর্থাৎ নেসাব থেকে 1/2 গ্রাম কোম পরলেই যাকাত লাগবে না।

I love prophet Muhammad sallallahu alaihe wa sallam

তারাই ভালো বন্ধু যারা জান্নাতের পথে মানুষকে আহবান করে।আসুন সবাইকে ইসলাম এর পথে আহবান করি।ফেইজবুকে সবাই ইসলাম প্রচার করি।সঠিক ও সত্যের পথে মানুষকে ডাকি।ইসলাম এর আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেই।(azizur rahman admin of islam is heaven. https://m.facebook.com/azizarlin?fref=nf&refid=28&_ft_=qid.6244099176686358576%3Amf_story_key.-5248736957036099687&__tn__=C)

Saturday, 6 February 2016

সত্যিকারের সৌন্দর্য।

সত্যিকারের সৌন্দর্য
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন ছাহাবী ছিলেন, যার নাম ছিল জুলায়বীব (রাঃ)। জুলায়বীব শব্দের অর্থ ‘ক্ষুদ্র পূর্ণতাপ্রাপ্ত’। এই নাম দিয়ে মূলতঃ জুলায়বীবের খর্বাকৃতিকে বুঝানো হ’ত। তিনি ছিলেন উচ্চতায় অনেক ছোট।

আনাস (রাঃ) বলেন, তিনি দেখতে কুশ্রীও ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বিবাহ করার কথা বললে তিনি নিজের কুশ্রী চেহারার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বিবাহের ক্ষেত্রে তো আমি অচল বা চাহিদাহীন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, হ’তে পারে, তবে আল্লাহর নিকটে তুমি অচল নও।

আবু বারযা আল-আসলামী (রাঃ) বলেন, জুলায়বীবের বিষয়টা এমন ছিল যে, সে মহিলাদের নিকটে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যেত। তারা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তোমরা জুলায়বীবকে তোমাদের নিকটে প্রবেশ করতে দিও না। কেননা সে যদি তোমাদের নিকটে আসে, তাহ’লে অবশ্যই আমি (কিছু) করব, আমি অবশ্যই (কিছু) করব। তাকে স্বীয় গৃহে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন। কোন মেয়ে জুলায়বীবকে বিবাহ করার কথা চিন্তাও করত না।

কিন্তু মহানবী (ছাঃ)-এর দৃষ্টিতে জুলায়বীবের অবস্থান ছিল অনেক উপরে। তিনি এই ছাহাবীর প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত, আবু বারযা আল-আসলামী (রাঃ) বলেন, আনছার ছাহাবীদের কারো মেয়ে থাকলে তারা ততক্ষণ পর্যন্ত কোথাও বিয়ে দিতেন না, যতক্ষণ না এ ব্যাপারে নিশ্চিত হ’তেন যে, রাসূল (ছাঃ)-এর তাকে বিয়ে করার প্রয়োজন নেই।

রাসূল (ছাঃ) জুলায়বীবের কথা চিন্তা করে একদিন এক আনছারীর কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাই’। আনছার লোকটা খুবই খুশী হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এতো খুবই বিস্ময়কর, সম্মান, আনন্দ ও আমার চক্ষু শীতলকারী খবর। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘আমি ওকে নিজের জন্য চাই না’। লোকটি (কিছুটা হতাশ হয়ে) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তাহ’লে কার জন্য? তিনি বললেন, ‘জুলায়বীবের জন্য’। এ কথা শুনে আনছার মনে একটা ধাক্কা খেলেন এবং নিচু গলায় বললেন, আমি এ ব্যাপারে মেয়ের মায়ের সাথে পরামর্শ করব। এই বলে লোকটি তার স্ত্রীর কাছে চলে গেলেন এবং সব খুলে বললেন। স্ত্রী তার মতই রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক জুলায়বীবের সাথে মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব শুনে স্তব্ধ হয়ে বললেন, জুলায়বীবের সাথে! না, কখনোই নয়। আল্লাহর শপথ! আমরা তাকে (নিজ মেয়েকে) তার (জুলায়বীবের) সাথে বিয়ে দেব না। তখন সেই আনছারী তার স্ত্রীর অমতের কথা রাসূল (ছাঃ)-কে জানাতে যাওয়ার জন্য উদ্যত হ’লেন। কিন্তু তার মেয়ে যে কি-না আড়াল থেকে সব শুনছিল। সে এসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদেরকে আমার বিয়ের ব্যাপারে কে প্রস্তাব দিয়েছেন? উত্তরে মা তাকে বললেন, রাসূল (ছাঃ) তাকে জুলায়বীবের সাথে বিয়ে দিতে অনুরোধ করেছেন।

যখন মেয়েটি শুনল যে, প্রস্তাবটি রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে এসেছে এবং তার মা সেটা প্রত্যাখ্যান করছেন, তখন সে দৃঢ়চিত্তে নিয়ে বলল, তোমরা কি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছ? আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাও, তিনি নিশ্চয়ই আমার জন্য ধ্বংস ডেকে আনবেন না।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, মেয়েটি বলল, আমি এ ব্যাপারে রাযী হ’লাম এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মতির প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম। তারপর সে মা-বাবাকে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি শুনিয়ে দিল ‘আর কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর জন্য উচিত নয় যে, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন সে ব্যাপারে তাদের কোন মতামত থাকে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছে’ (আহযাব ৩৬)। অতঃপর তার পিতা মেয়েকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরবারে গিয়ে তার মেয়ের দৃঢ়তার কথা জানালেন এবং বললেন, আমার মেয়ের জন্য যেটা ভাল মনে করেন সেটাই করুন। মেয়েটির মতামত শুনে রাসূল (ছাঃ) তাঁর জন্য দো‘আ করলেন,اللَّهُمَّ صُبَّ عَلَيْهَا الْخَيْرَ صبًّا وَلاَ تَجْعَلْ عَيْشَهَا كَدًّا كَدًّا


‘হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি কল্যাণ নাযিল কর এবং তার সংসার জীবন কষ্টদায়ক কর না’। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) জুলায়বীবের সাথে তার বিবাহ সম্পাদন করলেন।

এর অব্যবহিত পরেই রাসূল (ছাঃ) কোন এক যুদ্ধে বের হ’লেন এবং এক পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের বিজয় দান করলে রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীদের বললেন, তোমরা কি কাউকে হারিয়ে ফেলেছ? ছাহাবাগণ বললেন, না, আমরা কাউকে হারাইনি। তিনি বললেন, কিন্তু আমি যে জুলায়বীবকে দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা তাকে নিহতদের মাঝে খোঁজ কর। তারা খুঁজতে খুঁজতে সাতটি মৃতদেহের পাশে তার মৃতদেহ পেলেন। অর্থাৎ তিনি তাদের সাতজনকে হত্যা করেছেন। অতঃপর নিজে শাহাদত বরণ করেছেন। তারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে সব ঘটনা খুলে বললেন। সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ সেখানে গেলেন এবং বললেন, সে সাতজনকে হত্যা করেছে। অতঃপর তারা তাকে শহীদ করেছে। জেনে রেখো! সে আমারই মত আর আমিও তার মত (তথা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে- নববী, শরহে মুসলিম)। এভাবে তিনবার বললেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাকে নিজ কাঁধে বহন করে যথাস্থানে নিয়ে গেলেন এবং নিজ হাতে কবর খনন করে তাকে সমাহিত করলেন। ছাবেত (রাঃ) বলেন, তখন আনছারদের বিধবাদের মধ্যে ঐ মেয়েটির চেয়ে অধিক সম্পদশীলা ও দানশীলা আর কেউ ছিল না।



(আহমাদ হা/১৯৭৯৯, আরনাঊত্ব, সনদ ছহীহ; মুসলিম হা/২৪৭২, ইবনু হিববান হা/৪০৩৫, সনদ ছহীহ, ইবনে আব্দুল বার্র, আল-ইস্তি‘আব ফী মা‘রেফাতিছ ছাহাবা, পৃঃ ৮১)।

শিক্ষণীয় বিষয় : সমাজে জুলায়বীব (রাঃ) ছিলেন অবহেলিত, নিগৃহীত ও নিম্ন শ্রেণীর। কিন্তু তাঁর সততা, নিষ্ঠা, ঈমান-আমল ও আনুগত্যের কারণে মহানবী (ছাঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অনেক মর্যাদার অধিকারী। ইসলামে মানুষের মর্যাদা জন্মসূত্রে অথবা দেহবল্লবীতে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় তাক্বওয়ার ভিত্তিতে। যার বাস্তব উদাহরণ জুলায়বীবের উপরোক্ত ঘটনা।

দুরন্ত সাহসের কাহিনী।

দুরন্ত সাহসের কাহিনী
সাহসিকতা প্রত্যেক মানুষের একটি মৌলিক গুণ। এ সাহসিকতা ভাল কাজে ব্যবহার করলে সুনাম হয়। আর খারাপ কাজে ব্যবহার করলে বদনাম হয়। অন্যায়কারীর সামনে সত্য কথা বলে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রশংসনীয় কাজ। রাসূলুল­াহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হ’ল অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা’ (আবূদাউদ হা/৪৩৪৪; তিরমিযী হা/২১৭৪; মিশকাত হা/৩৭০৫)। যুগে যুগে মহান ব্যক্তিগণ এই সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের মধ্যে তাবেঈ ত্বাউস ইবনু কায়সান (রহঃ) অন্যতম।

ইসলামের পঞ্চম খলীফা হিসাবে খ্যাত ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর আমলে একজন বিখ্যাত তাবেঈ ছিলেন, যার নাম ত্বাউস। তাঁর বংশক্রম হ’ল আবু আব্দির রহমান ত্বাউস ইবনু কায়সান আল-খাওলানী আল-হামাদানী আল-ইয়ামানী। তিনি একজন দক্ষ ও বিজ্ঞ ফক্বীহ ছিলেন। তিনি ইবনু আববাস, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সহ অন্যান্য ছাহাবীগণের কাছ থেকে হাদীছ শুনেছেন। মুজাহিদ, আমর ইবনু দীনার সহ অনেকে তার নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ওমর ইবনু আব্দুল আযীয যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন ত্বাউস (রহঃ) তার কাছে পত্র লিখে বললেন, আপনি যদি চান যে, আপনার রাষ্ট্র ভালভাবে পরিচালিত হোক, তাহ’লে আপনি ভাল লোকদেরকে রাষ্ট্রীয় কাজে নিযুক্ত করুন। তখন ওমর ইবনু আব্দুল আযীয বলেন, আমার উপদেশ গ্রহণের জন্য তার এ কথাই যথেষ্ট। তিনি ১০৬ মতান্তরে ১০৪ হিজরী সনে মক্কায় ইয়াওমুত তারবিয়ার একদিন পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনু হাসান ইবনে আলী তাঁর জানাযার খাট বহন করেন এবং খলীফা হিশাম ইবনু আব্দিল মালেক তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন।

একদা খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালেক হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। তখন তিনি মক্কাবাসীকে বললেন, এ সময়ে কি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কোন ছাহাবী বেঁচে আছেন? বলা হ’ল, হে আমীরুল মুমিনীন! এতদিনে ছাহাবায়ে কেরাম মৃত্যুবরণ করেছেন। তখন তিনি বললেন, কোন তাবেঈ বেঁচে আছে কি? এসময় ত্বাউস ইবনু কায়সান ইয়ামানী (রহঃ) মক্কায় ছিলেন। প্রশাসনের লোকেরা গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকটে নিয়ে আসল। তিনি খলীফার নিকটে প্রবেশ করে তাঁর জুতা কার্পেটের পার্শ্বে খুলে রাখলেন। অতঃপর আস-সালামু আলাইকুম বলে খলীফার অনুমতি ব্যতীত তাঁর পার্শ্বে গিয়ে বসলেন। এরপর বললেন, হে হিশাম! আপনি কেমন আছেন? ত্বাউস (রহঃ)-এর আচরণে হিশাম কঠিনভাবে রেগে গেলেন এবং তাঁকে হত্যা করার মনোভাব প্রকাশ করলেন। তখন তাকে বলা হ’ল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি পবিত্র হারামে অবস্থান করছেন। আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) হারামের মধ্যে সব ধরনের হত্যাকান্ড নিষিদ্ধ করেছেন। অতএব এটা সম্ভব নয়। হিশাম বললেন, হে ত্বাউস! এ কাজ করার সাহস তুমি কোথায় পেলে? তিনি বললেন, আমি তো কোন অপরাধ করিনি। একথা শুনে খলীফা হিশামের রাগ আরও বৃদ্ধি পেল। তিনি বললেন, তোমার প্রথম অপরাধ তুমি কার্পেটের পার্শ্বে তোমার জুতা খুলে রেখেছ। দ্বিতীয় অপরাধ তুমি আমাকে আমীরুল মুমিনীন বলে সালাম দেওনি এবং আমাকে আমার উপনামে না ডেকে, নাম ধরে ডেকেছ। তারপর আমার অনুমতি ব্যতীত আমার পার্শ্বে এসে বসেছ। সর্বোপরি তুমি বলেছ, হে হিশাম! আপনি কেমন আছেন? তখন ত্বাউস (রহঃ) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ আমি আপনার নিকটে আসার আগে আমার জুতা খুলে কার্পেটের পাশে রেখেছি। আমি তো প্রতিদিন পাঁচবার আমার প্রভুর ডাকে সাড়া দেয়ার সময় জুতা খুলে রাখি, তিনি তো কখনও আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন না এবং আমার প্রতি রাগও করেন না। আপনি বলেছেন, আমি আপনাকে আমীরুল মুমিনীন বলে সালাম দেইনি। এর কারণ সমস্ত মানুষ আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট নয় এবং সবাই আপনাকে আমীরুল মুমিনীন হিসাবে মানেও না। তাই আমি আমীরুল মুমিনীন বললে তাতে মিথ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার অপর অভিযোগ, আমি আপনাকে উপনামে আহবান করিনি বরং আপনার নাম ধরে ডেকেছি। এর কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীগণকে তাদের স্ব স্ব নামে ডেকেছেন যেমন- ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি’ (ছোয়াদ ৩৮/২৬)। ‘হে ইয়াহইয়া (মারইয়াম ১৯/১২), হে ঈসা (ইমরান ৩/৫৫)! ইত্যাদি। আর তিনি তাঁর শত্রুদের উপনামে ডেকেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দু’হস্ত এবং সে নিজেও’ (লাহাব ১১১/০১)।

আমি আপনার অনুমতি ব্যতীত আপনার পার্শ্বে বসেছি। কারণ আমি আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তুমি যদি কোন জাহান্নামীকে দেখতে চাও, তাহ’লে ঐ ব্যক্তির দিকে তাকাও, যে বসে আছে, অথচ তার আশে-পাশে লোকেরা তার সম্মানে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আমি না দাঁড়িয়ে বসে পড়েছি। খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালেক তখন লা-জওয়াব হয়ে গিয়ে রাগ দমন করলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, হে ত্বাউস! আমাকে উপদেশ দাও। ত্বাউস (রহঃ) বললেন, আমি আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জাহান্নামে পাহাড়ের চূড়ার ন্যায় লম্বা লম্বা সাপ হবে এবং খচ্চরের মত বড় বড় বিচ্ছু হবে যা প্রজাদের প্রতি অত্যাচারী শাসকদেরকে দংশন করতে থাকবে। অতঃপর ত্বাউস (রহঃ) সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন (ইবনু খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ‘ইয়ান ২/৫০৯-৫১০)।